1. admin@protidinervor.com : admin :
সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৩:০৮ পূর্বাহ্ন

‘বাগমারা আবারও রক্তাক্ত পথে’: বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার পর হামলা, মামলা, আতঙ্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশের সময়ঃ বুধবার, ১২ নভেম্বর, ২০২৫

বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন ঘোষণার পর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা। ৩ নভেম্বর দলের মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই এ উপজেলায় রাজনৈতিক সহিংসতা শুরু হয়েছে। সবশেষ শনিবার দিবাগত রাতেও ককটেল হামলা এবং তিনটি পুকুরে বিষ প্রয়োগের ঘটনা ঘটেছে। রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ডিএম জিয়াউর রহমান জিয়া।

জিয়ার কর্মীরা এসব ঘটাচ্ছেন বলে অভিযোগ। বেশি প্রতিহিংসার শিকার হচ্ছেন এ আসনের আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব অধ্যাপক কামাল হোসেনের অনুসারীরা। মনোনয়ন ঘোষণার পর ওই রাতেই বাইগাছা গ্রামের এমরান আলী নামের এক ব্যক্তির সাড়ে ৬ শতক জায়গা দখলে নিতে প্রাচীর ভেঙে প্রজাতির গাছ কেটে ফেলা হয়। এমরানের অভিযোগ, বিএনপির প্রার্থী ডিএম জিয়ার লোকজন এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। এ নিয়ে সেদিনই থানায় তিনি একটি মামলা করেছেন।

শনিবার দিবাগত রাতে দুবিলা মধ্য দৌলতপুর বিলে অধ্যাপক কামাল হোসেনের চাচা ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক উপাধ্যক্ষ আব্দুস সোবহানের ইজারা নেওয়া তিনটি পুকুরে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। ৬০ বিঘার এই পুকুর তিনটিতে বিষ প্রয়োগের ফলে প্রায় ২ কোটি টাকার মাছ মারা গেছে। এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন জেলা যুবদলের সদস্যসচিব রেজাউল করিম টুটুলও। শনিবার রাতে টুটুল ও তার শ্বশুর আবদুস সামাদের বাড়িতে ককটেল হামলা করা হয়। টুটুলের বাড়িতে ফেলে রাখা ককটেলগুলো বিস্ফোরিত হয়নি। তবে তার শ্বশুর অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক আবদুস সামাদের বাড়িতে একটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়েছে। পুলিশ আলামত উদ্ধার করেছে। টুটুলের বাড়ি বাগমারার বুজরুককৌড় গ্রামে। আর তার শ্বশুরবাড়ি শান্তিপাড়া গ্রামে।

আব্দুস সোবহান বলেন, ‘এই পুকুরগুলো আগে চাষ করতেন ডিএম জিয়াউর রহমান। তিনি জমির মালিকদের ঠিকমত টাকা দিতেন না। পরে জমির মালিক আমাকে পুকুরগুলো দেন। আমি নিয়মিত টাকা দিয়ে মাছ চাষ করছি। এখানে শতাধিক পুকুর। বেছে বেছে আমার পুকুরগুলোতে বিষ দেওয়া হয়েছে। এটা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা।’

যুবদল নেতা টুটুল বলেন, মনোনয়ন ঘোষণার পর আমরা সবাই নিজেদের মতো কাজ করেছি। দ্বন্দ্ব-বিভেদ হয়নি। মনোনয়ন ঘোষণার পর এখন এসব ঘটনা ঘটছে। আমার শ্বশুর কোনো রাজনীতি করেন না। তিনি অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। তার বাড়িতে ককটেল হামলা করা হয়েছে। আমার বাড়িতেও ককটেল ছোঁড়া হয়েছে। সেটা বিস্ফোরিত হয়নি। সেগুলো আমরা দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দিয়ে উদ্ধার করিয়েছি।’

বাইগাছা গ্রামের এমরান আলী রাজনীতি করেন না। বিশেষ কোনো ব্যক্তির সমর্থকও নন। তার জমির প্রাচীর ভেঙে গাছপালা কেটে ফেলা হয়েছে। গত শুক্রবার সকালে বাইগাছা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পাকা রাস্তার পাশেই এমরা ওই জমিটি। রাস্তা সংলগ্ন ইটের প্রাচীর ভেঙে ফেলা হয়েছে। আম, মেহগনি, নারিকেল ও কলাগাছগুলো কাটা অবস্থায়। এমরান আলী বললেন, ‘এই জাগা আমার বাপের। দিলজান নামের এক ব্যক্তি জমির মালিকানা দাবি করে আদালতে পরাজিত হয়েছেন। কিন্তু দিলজানের কাছ থেকে জমি কিনেছেন দাবি করে দখলের চেষ্টা করছেন নওশের আলী। এতদিন সুবিধা করতে পারেনি। ৩ তারিখ ডিএম জিয়া কার্ড (মনোনয়ন) পাওয়ার পর দিন তার অনুসারী নেতা আবু সামা মিস্টার লোকজন পাঠিয়ে নওশেরের হয়ে জমি দখল করাইছে।’

তিনি দাবি করেন, তারা বাড়িতে ছিলেন। তখন বাইরে থেকে দরজা লাগিয়ে দিয়ে প্রাচীর ভাঙা হয় এবং গাছ কাটা হয়। ওই সময় তাদের হাতে নানারকম অস্ত্র ছিল। এমরানের স্ত্রী কাজলী আক্তার বলেন, ‘বাইর হোলিই মাইরবে বলে হুমকি দিছে। আমরা তাদের শক্তির সাথে পারিচ্চি না। কেস করার কারণে হাত-পা কাইটি দিবে বলে হুমকি দিছে।’

৩ নভেম্বর দিবাগত রাতে বোয়ালিয়া বিলে গোবিন্দপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমানের ইজারা নেওয়া ৫৫ বিঘা দিঘিতে বিষপ্রয়োগ করা হয়। আর বিলশণি গ্রামে পল্লি চিকিৎসক বীরেন্দ্রনাথ প্রামানিকের বাড়িতে আগুন দেওয়ার চেষ্টা হয়। দুজনেই স্থানীয় বিএনপির নেতা এবং কামাল হোসেনের পক্ষের লোক। শুক্রবার সকালে দিঘিপাড়েই পাওয়া যায় চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমানকে। দিঘির পাড়ে দেখা যায়, বড় বড় অনেক মাছ পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পানিতেও কিছু মাছ ভাসছে।

হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমি কামালের মঞ্চে ছিলাম, কিন্তু সব সময় বলেছি যে- যিনি ধানের শীষ পাবেন, তার পক্ষেই আমরা কাজ করব। কিন্তু ৩ তারিখে জিয়া মনোনয়ন পাওয়ার পর তার কর্মীরা আমাকে হুমকি দেয়। রাতেই দিঘিতে বিষ দিয়ে প্রায় ২ কোটি টাকার মাছ মেরে ফেলে।’

কান্নায় ভেঙে পড়ে হাবিবুর রহমান বলেন, ‘বিএনপি করার কারণে আগেও একবার নির্বাচিত হলেও ১২৬ ভোটে ফেল দেখানো হয়েছে। জেল খেটেছি, আমার ইটভাটার ইট লুট হয়েছে। এই সময়ে এসে আমার এ ক্ষতিটা হয়ে গেল। এখন পোনাওয়ালা, সারওয়ালা, ফিডওয়ালা আমার কাছে ৫৫ লাখ টাকা পাবে। এই টাকা শোধ করার ক্ষমতা আমার নাই।’

দিঘির পাড়ে ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হামিদ। বললেন, ‘বড় মাছ কইত্তি দিঘিত দু-আড়াই কেজি ওজনের মাছ ছাড়া হছিল। কম কইরি হোলি ২০০ মণ মাছ মরিছে। আশপাশের গিরাম থেইকি বহু মানুষ সব মরা মাছ ধরি লিয়্যা গেছে। উই (হাবিবুর) হয়্যা এখনুও দাঁড়া আছে। অন্য কেউ হোলি দাঁড়া থাইকতি পাইরলোনি। ফিট খাইয়্যা যাইত।’

বিলশণি গ্রামে পল্লি চিকিৎসক বীরেন্দ্রনাথ প্রামানিকের বাড়ি পাকা রাস্তার পাশেই। তিনি দেখালেন, ৩ নভেম্বর রাতে দুর্বৃত্তরা তার বাড়ির বারান্দার টিনের ওপরে আগুন দিয়েছিল। আগুন দ্রুত ছড়াতে দাহ্য পদার্থ ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বীরেন্দ্রনাথ বলেন, ‘রাত ২টার দিকে কয়েকজন লোক এসে আগুন দিয়ে যায়। তখনই রাস্তা দিয়ে একটি সিএনজি অটোরিকশা যাচ্ছিল। আগুন দেখে থেমে গিয়ে সিএনজির ড্রাইভার আমাদের ডাক দেয়। তখন আমিসহ প্রতিবেশীরা এসে আগুন নেভাই।’ তিনি দাবি করেন, তার কোনো শত্রু নেই। কামালের সমাবেশে যেতেন, তাই শত্রুতা হতে পারে।

বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এমরানের প্রাচীর ভাঙা ও গাছ কাটার ঘটনাটা প্রকাশ্যেই ঘটেছিল। তাই মামলা নেওয়া হয়েছে। রোববার সকালে আব্দুস সামাদের বাড়ির সামনে ককটেল বিস্ফোরণের আলামত পাওয়া গেছে। সেগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। টুটুলের বাড়ির সামনেও অবিস্ফোরিত দুটি ককটেল পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার তদন্ত চলছে। বীরেন্দ্রনাথের বাড়িতে রাতের অন্ধকারে আগুন দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। হাবিবুর রহমান ও আব্দুস সোবহানের পুকুরগুলোতেও বিষপ্রয়োগের ঘটনা রাতে। প্রত্যক্ষদর্শী নেই। তাই সরাসরি মামলা নেওয়া যায়নি। পুলিশ গিয়ে সরেজমিনে দেখে এসেছে। অভিযোগের ব্যাপারে তদন্ত চলছে।

প্রাথমিক মনোনয়ন ঘোষণার পরই এসব কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ বিএনপির স্থানীয় নেতারা। মনোনয়নবঞ্চিত নেতা উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব কামাল হোসেন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘বিএনপির মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকে পুকুরে বিষ প্রয়োগ, সংখ্যালঘুর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, জমি দখলসহ সকল সন্ত্রাসী ঘটনা এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে হুমকি আসছে। জরুরি ভিত্তিতে এই প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির সাথে জড়িত দুষ্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিএনপির হাইকমান্ডের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি। এমন ভয় দেখানোর রাজনীতি এখন তরুণ সমাজ এবং বাংলাদেশের জনগণ বর্জন করতে শিখেছে।’

উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও দলের প্রবীণ নেতা মাস্টার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘বাগমারা একসময় শান্ত ছিল। পরে রক্তাক্ত জনপদ হয়েছিল। এখন আবার যা ঘটছে তাতে দুর্যোগের ঘনঘটা। আমি জানি না, কেন্দ্র প্রার্থী নির্বাচনে কেন ভুল করল।’

উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল গাফফার বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ আমরাও শুনছি। এ রকম অবস্থাই চলছে বর্তমানে। আর কি বলব! আমরা আসলে এসব বিষয় নিয়ে হতাশ, ক্ষুব্ধও বটে। কিন্তু কিছু তো করার নেই।’

ডিএম জিয়াকে মনোনয়নন দেওয়ার কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেন উপজেলা বিএনপির সদস্য ও গণিপুর ইউপির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মনিরুজ্জামান রঞ্জু। তিনি বলেন, ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ছিলেন মোখলেসুর রহমান। তাঁকে ফেল করানোর জন্য আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সঙ্গে আঁতাত করে ডিএম জিয়াউর রহমান ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হন। ওই ভোটে তিনি পান ৯ হাজার ভোট। আর মোখলেসুর রহমান পান ৮৪ হাজার। ৮৭ হাজার ভোটে চেয়ারম্যান হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী।

তিনি দাবি করেন, ডিএম জিয়া দলের মহাসচিবের স্বাক্ষর জাল করেও একটি চিঠি করেছিলেন। এ জন্য তাকে বহিষ্কারও করা হয়েছিল। তাকে এমপি প্রার্থী করায় নেতাকর্মীদের সাড়া নেই। এখন এলাকায় আতঙ্ক তৈরি করে তিনি মাঠ গরম করতে চাচ্ছেন।

জানতে চাইলে ডিএম জিয়াউর রহমান জিয়া বলেন, ‘বাগমারায় ধানের শীষের জোয়ার চলছে। কে বলছে আমার লোক এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে? বাগমারার প্রতিটি লোকই তো আমার লোক। আসলেই কারা ঘটাচ্ছে সে বিষয়ে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। প্রশাসন তদন্ত করে ব্যবস্থা নিক।’

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগোরির আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2025